সামাজিক সমস্যার কারণসমূহ
সামাজিক সমস্যার জন্য বিশেষ কোনো একটি কারণকে এককভবে দায়ী করা ঠিক নয়। যেমন জনসংখ্যাবৃদ্ধি বাংলাদেশ কিংবা ভারতের মতো দেশের জন্য সব চেয়ে বড়ো সামাজিক সমস্যা। তবে শুধু একটি নয় বরং এই জনসংখ্যা বিস্ফোরণের জন্য বা অতিহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধর জন্য অনেকগুলো কারণ জড়িত রয়েছে। প্রাকৃতিক, মানসিক, শারীরিক, আর্থিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদির প্রভাব রয়েছে অপ্রত্যাশিত হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য। সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে এমন কারণসমূহ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উভয়ভাবেই থাকতে পারে।
সামাজিক বিজ্ঞানীরা সামাজিক সমস্যার পেছনে মূল কারণ হিসেবে যেগুলো চিহ্নিত করেছেন, সেগুলো নিচে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো:
১. প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক কারণ: প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। বন্যা, খরা, জলোচ্ছাস, মহামারী, ঝড় ইত্যাদির জন্য সন্ত্রাস, দারিদ্র, অপরাধ, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদির সৃষ্টি হতে পারে। আবার অতি উষ্ণ অথবা শীত অঞ্চল, পাহাড়িয়া অথবা উপকূলীয় এলাকায়ও এসমস্ত সামাজিক সমস্যার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে সামাজিক সমস্যা সৃষ্টিতে প্রাকৃতিক ও ভৌগলিক কারণের প্রভাব পরোক্ষ ধরনের।
২. শারীরিক ও মানসিক কারণ: শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা, অনেক সময় জনসংখ্যাবৃদ্ধি, অপসাংস্কৃতির অনুকরণ, বঞ্চনা, হতাশা, চাপ ও পীড়ন, নেশাগ্রস্থতা ইত্যাদি সমাজে সমস্যার জম্ম দেয়। শারীরিক গঠন ও অনেক সময় মানুষকে অপরাধ প্রবণ করে তোলে।
৩. অর্থনৈতিক কারণ: সমাজের প্রত্যেকেরই ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকা অত্যাবশ্যক। মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আর্থিক সঙ্গতি থাকা দরকার। সমাজে সম্পদ ও সুযোগের সুষম বন্টন, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ইত্যাদির নিশ্চয়তা না থাকলে সৃষ্টি হয় বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা। দারিদ্রকে বলা হয় সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির মূল কারণ। সত্যিকার অর্থে, অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা এবং অতি স্বচছলতা উভয় কারণই সমাজে দুর্নীতি, অপরাধ, সন্ত্রাস, নিরক্ষরতা, অপুষ্টি, বস্তিসহ নানা ধরনের সামাজিক সমস্যার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।
৪. সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ: সামাজিক পরিবর্তন, শহুরে দারিদ্র ও বস্তি সমস্যা, অপরাধ ও কিশোর অপরাধ, অজ্ঞতা ও কুসংস্কার, মূল্যবোধের অবক্ষয়, কর্মমুখী ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত ইত্যাদি সামাজিক সমস্যার পেছনে বড়ো কারণ হিসেবে দেখা দেয়।
৫. রাজনৈতিক কারণ: রাজনৈতিক কারণেও সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়ে থাকে। দ্রুত ও ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণতন্ত্র চর্চার অভাব, সুশাসনের অনুপস্থিতি, দেশপ্রেমের অভাব, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ইত্যাদির কারণে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। গঠনমূলক সামাজিক নীতি ও পরিকল্পনা এবং দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে না উঠলে উপস্থিত সামাজিক সমস্যাগুলোও মোকাবেলা করা যায় না।
৬. আন্তর্জাতিক প্রভাবজনিত কারণ: বিজ্ঞানের উন্নতিতে বর্তমান বিশ্বে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই সহজ ও দ্রুততর হয়েছে। বিজ্ঞান মানুষের কল্যাণ বয়ে এনেছে সত্য, কিন্তু এর পাশাপাশি কিছু সমস্যারও সৃষ্টি হয়েছে। বিজ্ঞানের উন্নতিতে অনেক রকমের সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। যেমন, ড্রাগ ও অস্ত্রের চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে, বৈধ-অবৈধ বাণিজ্যচক্রের প্রভাব বেড়েছে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তৃত হয়েছে, সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ ঘটছে ইত্যাদি যা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির কিছু বড়ো বড়ো কারণ। বর্তমান যুগ সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ, এ যুগে সোশ্যাল মিডিয়াতে বিভিন্ন রকম গুজব, আপত্তিকর কন্টেন্ট, বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হয়।
সামাজিক সমস্যা সমাধান বা মোকাবেলার উপায়সমূহ
যেখানে সমাজ আছে, সেখানে সমস্যাও আছে। সমাজে বিরাজমান ওই সমস্যাই হলো সামাজিক সমস্যা। আবার সামাজিক সমস্যাগুলো এমন নয় যে, ওগুলো সমাধান, মোকাবেলা বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কিন্তু সামাজিক সমস্যা যেমন একদিনে কিংবা একবারে সৃষ্টি হয় না, তেমনই একদিনে বা একবারে শেষও হয় না। তবে কথা হলো কোনো একটি সামাজিক সমস্যা চরম আকার ধারণ করার আগেই তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং তা করতে হবে সংঘবদ্ধ হয়ে।
নিচে সামাজিক সমস্যা মোকাবেলা করার বিভিন্ন উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. সামাজিক গবেষণা ও অনুসন্ধান কাজ পরিচালনা: সামাজিক সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে সুপরিকল্পিতভাবে; এর জন্য বিভিন্ন জরিপ, গবেষণা ও অনুসন্ধানমূলক কাজ জরুরি। এই প্রক্রিয়ায় সমস্যার ধরন, কারণ, প্রভাব, নিরসনের উপায় ইত্যাদি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।
২. পরিকল্পনা প্রণয়ন: গবেষণা করে বা পদ্ধতিগত অনুসন্ধান করে তা থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে সমস্যা মোকাবেলার জন্যে উপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পরিকল্পনা মাফিক কাজ করতে পারলে খরচ, শ্রম ও সময় যেমন কম লাগবে, তেমনি সমস্যা দূরীকরণও সহজ হবে।
৩. মানব সম্পদ উন্নয়ন: সামাজিক সমস্যা সমাধান করার জন্য এ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ও পরিকল্পনা বিষয়ে জনসাধারণকে অবহিত করতে হবে। এতে জনগণ সচেতন, সক্রিয় ও উদ্যোগী হয়ে সমস্যা মোকাবেলায় স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করবে। তাছাড়া দেশের সকল শ্রেণিরর নাগরিকদেরকে শিক্ষিত করতে হবে এবং স্বাস্থ্য, অধিকার-কর্তব্য, জাতীয় উন্নয়ন, সম্পদের সদ্ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তাদেরকে মানব সম্পদে রূপান্তরিত করতে হবে। এতে সামাজিক সমস্যা সৃষ্টির আগে যেমন প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে, তেমনি উপস্থিত সমস্যা সমাধানেও সফল হতে পারবে। দেশের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে বা মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৪. সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার: দেশের মানবীয় ও বস্তুগত সম্পদের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার করতে হবে। কেননা, মানুষের সমস্যা মেকাবেলায় উপযোগী বহু সম্পদই অব্যবহৃত থেকে যায়। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে উপস্থিত সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে যে-কোনো সামাজিক সমস্যাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
৫. মৌলিক ও মানবিক চাহিদাপূরণ এবং সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টন: মানুষের মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ না হলে সমাজ থেকে সমস্যা দূর হবে না। তাই সকলের ন্যূনতম আয় ও কর্মসংস্থান খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ইত্যাদির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। পাশাপাশি, দেশের সকল সম্পদ ও সুযোগের বন্টন সুষম করতে হবে। তা না হলে সৃষ্টি হবে বৈষম্য, শোষণ, শ্রেণিদ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ ইত্যাদি। ফলে নানা ধরনের সামাজিক সমস্যার সৃষ্টি হবে এবং তা ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করবে।
৬. সুনেতৃত্ব ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা: সমাজের প্রতিটি বিষয়ই রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হয়। দেশে সুশাসন, ভালো রাজনীতি, যোগ্য নেতৃত্ব এবং সুশাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই সুষ্ঠুভাবে যে-কোনো সমস্যা নিরসন করা সম্ভব হবে। দেশ ও সমাজ উন্নয়নের এটিই হলো প্রধান পূর্বশর্ত।
৭. স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো শক্তিশালীকরণ ও গনতন্ত্র চর্চা: সরকারের (কেন্দ্রীয় প্রশাসন) একার পক্ষে দেশের সকল সমস্যা সম্পর্কে জানা ও মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাই বিভিন্ন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়ে সকলকে সুযোগ দিতে হবে সামাজিক সমস্যা মোকাবেলায় অংশগ্রহণ করতে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক সমস্যা দূরীকরণ সহজ হয়।
৮. বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও (NGO) এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করা: বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানে প্রতিটি দেশেই অনেক রকমের এনজিও কাজ করে। সরকার বা প্রশাসনের উচিৎ হবে এনজিওগুলোকে আরও কাছে টেনে নিয়ে তাদের সহযোগিতায় সামাজিক সমস্যামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেও এক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে। ধর্মীয় নেতাদের উপদেশ ও পরামর্শে মানুষ আরও আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসবে সামাজিক সমস্যা মোকাবেলা করতে।
উপসংহার
সামাজিক সমস্যা সমাজ হতে উদ্ভূত একটি অপ্রত্যাশিত অবস্থা যা সমাজের অধিকাংশ লোকের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। এতে মানুষ উদ্বিগ্ন, উত্তেজিত ও আন্দোলনমুখী হয়। সমস্যা মোকাবেলায় সমাজ সদস্যরা সংঘবদ্ধ হয় এবং এর মাধ্যমে সমস্যা সমাধান বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। সমাজে সমস্যা যেমন আছে, তেমনি সমস্যা সমাধান করার উপায়ও রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য সংঘবদ্ধভাবে বা সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা করতে হবে।
নীতি কাকে বলে?
নীতি শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘Policy’। সাধারণ অর্থে নীতি হলো কোনো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের পথনির্দেশিকা।
নীতি হলো কোনো লক্ষ্য অর্জনের সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা। সমাজজীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যার্জনের জন্য কর্মপন্থা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্দেশনাই হলো নীতি। সাধারণভাবে কোনো কাজ সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে পরিচালনা করার মাধ্যমে বাঞ্ছিত ও ইপ্সিত লক্ষ্যে উপণীত হওয়ার জন্য যেসব নিয়মকানুন, পদ্ধতি বা কর্মকৌশল, যা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকার কর্তৃক আদর্শ হিসেবে গৃহীত হয় তাকেই নীতি বলে।
অ্যান্ড্রু মরিস বলেছেন যে, নীতি হলো এমন কোনো আইনসিদ্ধ নিয়মাবলির সমষ্টিগত রূপ যা সংশ্লিষ্ট বিভাগের লক্ষ্য অর্জনে অনুসরণ করা হয়।
সামাজিক নীতির বৈশিষ্ট্য
সমাজের কাঙ্খিত পরিবর্তন সাধন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সমাজসেবা কার্যক্রম গ্রহণ ও পরিচালনার জন্য সরকার কর্তৃক সুসমন্বিত নীতিমালা ও কর্মকৌশল হলো সামাজিক নীতি। জনসাধারণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করে সমাজের গতিশীলতা ত্বরান্বিত করতে সামাজিক নীতি প্রণয়ন করা হয়। সামাজিক নীতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো:
- সামাজিক নীতি সামাজিক উন্নয়নের পথনির্দেশক ও অনুসরণীয় আদর্শ।
- সামাজিক নীতি সমাজসেবামূলক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কর্মপ্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজসেবামূলক কাজের শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা পায়।
- সামাজিক নীতি জনগণের মানবীয় প্রয়োজন পূরণ ও সামাজিক সমস্যা দূরীকরণে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে।
- সামাজিক নীতি সরকার কর্তৃক গৃহীত হয় এবং সরকার ও জনগণের যৌথ প্রচেষ্টায় তা বাস্তবায়িত হয়।
- সামাজিক নীতি সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ অনেকগুলো বিকল্প কর্মপন্থা থেকেকোনটি গ্রহণ করা হবে তা নির্ধারণ করে দেয়।
- সামাজিক নীতি বাঞ্ছিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়। সুপরিকল্পিত উপায়ে সমাজের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে বাঞ্ছিত পরিবর্তন আনয়নের জন্য সামাজিক নীতি প্রণীত হয়।
- সামাজিক নীতি সামাজিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।সামাজিক নীতি সামাজিক কার্যক্রমকে উৎসাহিত করে। কারণ সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনেক সময় বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা । যেমন: কুপ্রথা, কুসংস্কার, অজ্ঞতা প্রভৃতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসব বাধা দূর করতে প্রয়োজন হয় সামাজিক কার্যক্রমের। সামাজিক নীতি এর ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।
- সামাজিক নীতি সমাজে বসবাসরত মানুষকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করে। সামাজিক নীতি এমনভাবে প্রণয়ন করা হয় যাতে মানুষ পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্য বিধানে সক্ষম হয়।
- সামাজিক নীতি সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে সামাজিক সমতা, স্থিরতা, শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
সারাংশ
নীতি হলো কোনো লক্ষ্য অর্জনের কর্মপন্থা। সমাজজীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যার্জনের জন্য কর্মপন্থা সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্দেশনাই হলো নীতি। সাধারণভাবে কোনো কাজ সুষ্ঠুও সঠিকভাবে পরিচালনা করার মাধ্যমে বাঞ্ছিত ও ইপ্সিত লক্ষ্যে উপণীত হওয়ার জন্য যেসব নিয়মকানুন, পদ্ধতি বা কর্মকৌশল যা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকার কর্তৃক আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয় তাকেই নীতি বলা হয়। অন্যদিকে, সামাজিক নীতি হলো সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ সাধনের লক্ষ্যে গৃহীত কর্মপন্থা। সামাজিক নীতি হলো সেসব নিয়ম-কানুন বা কর্মপন্থা, যা কেবল সমাজকল্যাণমূলক কোনো কর্মসূচি প্রণয়ন বা বাস্তবায়নের লক্ষ্য ক্ষেত্রে পথনির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে।
সাংবাদিকতা কী?
সাংবাদিকতা হলো বিভিন্ন ঘটনাবলী, বিষয়, ধারণা, মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ, সমাজ, রাষ্ট্র সম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরি ও পরিবেশন, যা উক্ত দিনের প্রধান সংবাদ এবং তা সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। এই পেশায় শব্দটি দিয়ে তথ্য সংগ্রহের কৌশল ও সাহিত্যিক উপায় অবলম্বনকে বোঝায়। মুদ্রিত, টেলিভিশন, বেতার, ইন্টারনেট, এবং পূর্বে ব্যবহৃত নিউজরিল সংবাদ মাধ্যমের অন্তর্গত।
যে পেশায় কর্মীরা বিভিন্ন ঘটনাবলী, বিষয়, ধারণা, মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ, সমাজ, রাষ্ট্র সম্পর্কিত সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই ও উপযুক্ততা বিচার করে তা পরিবেশনের মাধ্যমে জনকল্যাণমুখী কাজ কাজে সহায়ক ভূমিকা রাখে তাকে সাংবাদিকতা বলে।
সাংবাদিকতা আধুনিক বিশ্বে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পেশা। সাংবাদিকতার যথোপযুক্ত নিয়মের ধারণা ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কিছু দেশে, সংবাদ মাধ্যমে সরকারি হস্তক্ষেপে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং পুরোপুরি স্বাধীন সত্তা নয়। অন্যান্য দেশে, সংবাদ মাধ্যম সরকার থেকে স্বাধীন কিন্তু লাভ-লোকসান সাংবিধানিক নিরাপত্তার আওতায় থাকে। স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক সাংবাদিকতার মাধ্যমে সংগ্রহ করার মুক্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে প্রবেশাধিকার জনগণকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যোগ দিতে সাহায্য করে।
সাংবাদিকতার ধরন
বিভিন্ন ধরনের পাঠকের জন্য সাংবাদিকতার বিভিন্ন ধরন রয়েছে। একটি একক প্রকাশনায় (যেমন সংবাদপত্র) বিভিন্ন ধরনের সাংবাদিকতা উপাদান থাকে এবং প্রত্যেক উপাদান বিভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়। সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন বা ওয়েবসাইটের প্রত্যেকটি বিভাগ ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের জন্য সংবাদ সরবরাহ করে থাকে। সাংবাদিকতার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ধরন হলো—
- ওকালতি সাংবাদিকতা: কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা পাঠকের মতামতের প্রভাব সমর্থন করে লেখা হয়।
- ফটোসাংবাদিকতা: সাংবাদিকতা যা একটি সংবাদ গল্প বলার জন্য ছবি ব্যবহার করে। এটি সাধারণত শুধুমাত্র স্থির চিত্রকে বোঝায়, তবে সম্প্রচার সাংবাদিকতায় ব্যবহৃত ভিডিওকেও উল্লেখ করতে পারে।
- সম্প্রচার সাংবাদিকতা: বেতার বা টেলিভিশনের জন্য লিখিত সাংবাদিকতা।
- নাগরিক সাংবাদিকতা: নাগরিকদের অংশগ্রহণমূলক সাংবাদিকতা।
- উপাত্ত সাংবাদিকতা: ঘটনাবলী সংখ্যায় খুঁজে বের করার এবং তা সংখ্যায় প্রকাশ করার রীতি।
- ড্রোন সাংবাদিকতা: ড্রোন ব্যবহার করে বিভিন্ন ফুটেজ সংগ্রহ করা।
- গঞ্জো সাংবাদিকতা: হান্টার এস থম্পসন কর্তৃক উদ্ভাবিত গঞ্জো সাংবাদিকতা হল প্রতিবেদন প্রণয়নের নিজস্ব উপায়।
- পারস্পারিক ক্রিয়াশীল সাংবাদিকতা: অনলাইন সাংবাদিকতার একটি ধরন যা ওয়েবে উপস্থাপন করা হয়।
- অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: সামাজিক সমস্যাসমূহ উদ্ঘাটন করে এমন প্রতিবেদন।
- আলোকচিত্র সাংবাদিকতা: চিত্রের সাহায্যে সত্য ঘটনাসমূহ উপস্থাপনের রীতি।
- সেন্সর সাংবাদিকতা: অনুসন্ধানের লক্ষ্যে সেন্সর ব্যবহার করা।
- টেবলয়েড সাংবাদিকতা: বিনোদনমূলক সংবাদ প্রণয়ন, যা মূলধারার সাংবাদিকতা থেকে কম বৈধ।
- হলুদ সাংবাদিকতা: অতিরঞ্জিত অভিযোগ বা গুজব বিষয়ক প্রতিবেদন।
ক্রীড়া সাংবাদিকতা ক্রীড়া সাংবাদিকতা অপেশাদার এবং পেশাদার ক্রীড়া খবর এবং ঘটনা রিপোর্ট উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। ক্রীড়া সাংবাদিক সকল প্রিন্ট, টেলিভিশন সম্প্রচার এবং ইন্টারনেট সহ মিডিয়াতে কাজ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমের বিকাশের ফলে সাংবাদিকতাকে একটি প্রক্রিয়া না বলে নির্দিষ্ট সংবাদ পণ্য বলে অভিহিত করার বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে। এই বিবেচনায়, সাংবাদিকতা হল এক ধরনের অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া যেখানে একাধিক লেখক ও সাংবাদিক এবং সামাজিকভাবে মধ্যস্থতাকারী জনগণ জড়িত থাকে।
সাংবাদিকতার ইতিহাস
ইয়োহান কারোলাসের ১৬০৫ সালে স্ট্রাসবুর্গ থেকে প্রকাশিত রিলেশন অলার ফুর্নেমেন উন্ড গেডেনকভুর্ডিগেন হিস্টরিয়েনকে প্রথম সংবাদপত্র বলে অভিহিত করা হয়। প্রথম সফল ইংরেজি দৈনিক হল ১৭০২ থেকে ১৭৩৫ সালে প্রকাশিত ডেইলি ক্যুরান্ট। ১৯৫০ এর দশকে দিয়ারিও কারিওকা সংবাদপত্রের সংস্কার রূপকে ব্রাজিলে আধুনিক সাংবাদিকতার জন্ম বলে চিহ্নিত করা হয়।
১৯২০ এর দশকে যখন আধুনিক সাংবাদিকতা রূপ ধারণ করতে শুরু করে লেখক ওয়াল্টার লিপম্যান এবং মার্কিন দার্শনিক জন ডিউয়ি গণতন্ত্রে সাংবাদিকতার ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেন। তাদের এই ভিন্ন ভিন্ন দর্শন এখনো সমাজ ও রাষ্ট্রে সাংবাদিকতার ভূমিকা বিষয়ে যুক্তি প্রদর্শনে ব্যবহৃত হয়।
সাংবাদিকতায় পেশাদারী ও নৈতিক মানদণ্ড
সাংবাদিকতায় বিদ্যমান নৈতিক মানদণ্ডে ভিন্নতা রয়েছে, বেশিরভাগই রীতিতে সত্যতা, সূক্ষ্মতা, বিষয়বস্তুর উদ্দেশ্য, পক্ষপাতহীনতা, এবং কৈফিয়ত— এই বিষয়গুলো সাধারণ উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই উপাদানসমূহ সংবাদ করার মত তথ্য সংগ্রহ করতে এবং জনগণের কাছে প্রচার করতে ব্যবহৃত হয়।
কিছু সাংবাদকিতার নৈতিকতার বিধিতে, বিশেষ করে ইউরোপীয় বিধিতে, সংবাদে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বিষয়ক, এবং শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা নিয়ে বৈষম্যমূলক সূত্র বিষয়েরও অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। আবার কিছু ইউরোপীয় নৈতিকতার বিধিতে, সকল সংবাদপত্র ইনডিপেন্ডেন্ট প্রেস স্ট্যান্ডার্টস অর্গানাইজেশনের বিধি মেনে চলতে বাধ্য এবং তা যুক্তরাজ্যেও প্রচলিত। এই বিধিতে জনগণের গোপনীয়তাকে সম্মান দেওয়া এবং নিখুঁতভাবে কাজ নিশ্চিত করা অন্তর্ভুক্ত।




No comments:
Post a Comment